সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ভারতের মিথ্যাচার

চীন-ভারত প্রত্যাহার মানে উভয় দেশকে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) থেকে ১.৫ কিলোমিটার দূরে তাদের সেনাদের সরিয়ে নিতে হবে। ভারতীয় অনেক মিডিয়া এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে একে চীনের পিছু হটা বলছে। অথচ বাস্তবতা হলো এই যে কেবল চীন একতরফাভাবে নয়, উভয় পক্ষই সেনা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এই ঘটনা থেকে প্রথম শিক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্ণনামূলক পর্যবেক্ষণ। সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ভারতের মিথ্যাচার

ভুয়া কাহিনী সৃষ্টি

মোদির ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে ভারতীয় লোকজনকে উগ্র চরমপন্থী প্রপাগান্ডায় (জ্বি হ্যাঁ, ভুয়া খবরের মতো আক্ষরিক প্রপাগান্ডা ও ‘ধারণা ব্যবস্থাপনার’ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পরিকল্পিত বিভ্রান্তিকর ‘প্রতিবেদন’) আসক্ত করা হয়েছে। দেশীয় ধারণাগত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের এতটাই বাইরে চলে গেছে যে ভারত সরকারের পক্ষে আর সত্য কথা প্রকাশ সম্ভব নয়। কিন্তু তারা আর যা করতে পারে তা হলো, উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য প্রচার করে জনসাধারণকে দাঙ্গায় নিয়োজিত করতে পারে। এ কারণেই পারস্পরিক প্রত্যাহারকে একতরফা প্রত্যাহার হিসেবে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা হচ্ছে।

এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো এই ধারণা প্রচার যে ভারত একটি ‘পরাশক্তি’। যেকোনো মানদণ্ডে একটি অদ্ভূত দাবি। তবে বিস্ময়করভাবে বছরের পর বছর ধরে মগজ ধোলাইয়ের কারণে অনেক লোকই এই ধারণায় বিশ্বাস করে। নিজেদের দেশ সম্পর্কে মিথ্যা ধারণার বশবর্তী হওয়ার কারণে অব্যাহতভাবে তাদের নিজেদের বলে দাবি করা ১.৫ কিলোমিটার এলাকা থেকে তাদের সরকারের প্রত্যাহারকে তারা মেনে নিতে পারছে না। বিশেষ করে গত মাসে ভারতের চেয়ে চীনা হতাহত ৫ গুণ ছিল বলে মিথ্যা প্রচারণার পর তাদের পক্ষে তাদের প্রত্যাহার মেনে নেয়া কঠিনই। তা সত্ত্বেও এটি অনিবার্য যে জনসাধারণ শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা মেনে নেবে এবং তারা আগে হোক বা পরে হোক, সত্য আবিষ্কার করতে পারবে। আর এ কারণেই গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী মোদি ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়া সফরে বিরোধপূর্ণ সীমান্তে গিয়েছিলেন।

এখন জানা যাচ্ছে, দুই পক্ষ পারস্পরিক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে সফল আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই সফরটি হয়েছিল। এর মানে হলো এই যে এই পদক্ষেপটি ছিল স্রেফ ‘ধারণাগত ব্যবস্থাপনার’ সাথে সম্পর্কিত। তিনি এর মাধ্যমে প্রচার করতে চেয়েছেন যে তার কারণেই চীনারা প্রত্যাহার করছে। বাস্তবে তা ঘটেনি।

তবে এর মাধ্যমে ভারতের প্রচারবিদেরা একথা প্রচার করার সুযোগ পায় যে চীনকে ‘মুখ রক্ষার’ সুযোগ দিতে তাদের দেশ সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, গত মাসের ঘটনার পর গালওয়ান উপত্যকায় চীন তাদের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা প্রত্যাহার করেছে কেবল উত্তেজনা প্রশমনের জন্য।

কূটনীতিতে চীনের হাজার বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং মনে হচ্ছে যে ভারতের আমেরিকানপন্থী পিভোটের গতি মন্থর করার জন্য এই উদ্যোগ দরকারি ছিল। অন্য কোনো উপায়ে তা রোধ করা অসম্ভবই মনে হচ্ছিল।

অর্থনৈতিকভাবে চীনকে বয়কট করার প্রচণ্ড চাপে ছিল ভারত সরকার। বয়কটের ঘোষণা না দিয়ে তার পক্ষে মুখ রক্ষার জন্য পারস্পরিক প্রত্যাহারে রাজি হওয়া সম্ভব ছিল না। চীনের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাৎক্ষণিক যে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা থেকে রক্ষা পেতে পারবে না ভারতীয় অর্থনীতি। আবার এই বিচ্ছিন্নতা চীনের জন্যও ক্ষতিকর হবে, যদি সে এই মানের আর কোনো বাজার না পায়।

অন্য ভাবে বলা যায়, পারস্পরিক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ২০১৭ সালের মতো স্নায়ুশান্তির (অবশ্য স্বল্পস্থায়ী) সূচনা করতে পারে। চীন এটা মেনে নিয়েছে যে তাকে সংযত করার জন্য ভারত যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি হওয়াটা গ্রহণ করে নিয়েছে। তবে অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা যতটা সম্ভব ব্যবস্থাপনা করা যায়, সেটিই এখনকার লক্ষ্য চীনের আর এ কারণেই চীন এখন প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখ রক্ষার কাজে সহায়তা করছে পারস্পরিক প্রত্যাহারের মাধ্যমে।

গ্লোবাল ভিলেজ স্পেস আবলম্বনে

সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ভারতের মিথ্যাচার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *