ভারত ঘনিষ্ঠতার জের, চীনের সঙ্গে তৃতীয় সীমান্ত বিরোধে ভুটান

চীন ও ভারতের মাঝে থাকা শান্তিপূর্ণ ছোট্ট হিমালয়ান দেশ ভুটান। চীনের সঙ্গে দেশটির দুটি সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২৪ দফা আলোচনাও হয়েছে। সম্প্রতি তৃতীয় বিরোধটি সামনে আসে।

ভুটান পূর্বাঞ্চলে সাকতেং বণ্যপ্রাণী অভয়াণ্যের জন্য গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএ)’র কাছে অনুদানের আবেদন করেছিলো। কিন্তু গত ২৯ জুন চীন তাতে আপত্তি জানায়। চীন বলে ভুটানের ত্রাশিগাং জেলার পূর্ব দিকে অবস্থিত ৬৫০ বর্গকিলোমিটার অভয়ারণ্যটি বিতর্কিত অঞ্চল।

সূত্র জানায়, চীনের এই দাবি থিম্পুতে ভয়ের শিহরণ বইয়ে দিয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে তারা সাহসী চেহারা দেখানোর চেষ্টা করছে।

বুধবার নয়া দিল্লির রাজকীয় ভুটান দূতাবাস থেকে দেয়া দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, দুই পক্ষের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে ২৪ দফা আলোচনা হয়েছে এবং করোনার কারণে ২৫তম দফা আলোচনা বিলম্বিত হচ্ছে। পরস্পর সম্মত সময়ে শিগগিরই অনুষ্ঠিত পরবর্তী দফা বৈঠকে সব বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা হবে।

চীনের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রাখলেও ভারতের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ ভুটান। চীনের সঙ্গে ভুটানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। বলা হয়, ভারতের চাপের কারণে ভুটান এ ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে পারছে না।

২০০৭ সাল পর্যন্ত অন্য দেশের সঙ্গে ভুটানের সম্পর্ক দেখভাল করতো ভারত। তবে দুই দেশের মৈত্রি চুক্তিতে পরিবর্তন আনার পর ভুটানকে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়। তবে চীন ও ভারতের বিরোধের মধ্যে আটকা পড়ার আশঙ্কাই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ভুটানকে।

২০১৭ সালে দোকলামে চীন ও ভারতের মধ্যে অচলাবস্থার কেন্দ্রে জড়িয়ে যায় ভুটান। এলাকাটি চীন ও ভুটান দুই দেশই দাবি করছে। ভারত ভুটানকে সমর্থন করে। ওই এলাকা ভারতের কৌশলগত শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি। এই করিডোর দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিকভাবে বিরোধটির মিমাংসা হয়।

ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন- বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের উপর চীনা দাবি আসলে ভারতকে লক্ষ্য করেই, কারণ স্থানটি বিতর্কিত অরুনাচল প্রদেশের কাছাকাছি। চীন এই প্রদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করে না এবং একে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে মনে করে।

গত জুনে গালওয়ান উপত্যকায় দুই বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ সংর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হয়। চলতি সপ্তাহে দুই পক্ষ লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল নামে পরিচিত অচিহ্নিত সীমান্ত রেখার কাছ থেকে সেনা সরিয়ে নেয়ার কাজ করছে। এটা হচ্ছে ধাপে ধাপে।

শিব নাদার ইউনিভার্সিটির এসোসিয়েট প্রফেসর ড. জাবিন টি জ্যাকব বলেন, চীন এখন যে দাবি করছে তার ভিত্তি হলো এলাকাটি ঐতিহাসিকভাবে তিব্বতের অংশ, যদিও ভুটানকে এলাকাটি ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছে। এর মানে হলো আন্তর্জাতিক সংস্থায় তিব্বতের উপর চীনের দাবি আরো মজবুত হলো। আর সে কারণেই এই ফ্রন্ট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

তিনি বলেন, ভুটান ও ভারতের জন্য ফলাফল হলো, দোকলাম ভুলে যাওয়া হয়নি বা মাফ করেও দেয়া হয়নি। ভারত ও ভুটান যে বিশেষ সম্পর্ক উপভোগ করছে তাতে ফাটল ধরাতে চীন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চীন বহু বছর ধরে যে বিপুল ও মূল্যবান ভূখণ্ডগত দাবি জানিয়ে আসছে তার একটি ধরন এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ভুটানের মিডিয়ায় বর্তমান সীমান্ত বিরোধ তেমন গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়নি। যদিও সামজিক গণমাধ্যম এই দাবির ব্যাপারে সচেতন।

দ্য ভুটানিজ পত্রিকার সম্পাদক তেনজিং লামসাং এক টুইটে বলেন, এমন কি চীনের মানচিত্রেও এই অভয়ারণ্যকে ভুটানের দেখানো হয়েছে। তিনি লিখেন- ১৯৭৭ সালের চীনা মানচিত্রেও সাকতেংকে ভুটানের মধ্যে দেখানো হয়েছে, যদিও তারা পুরো অরুনাচল প্রদেশকে নিজেদের দাবি করে।

স্টেইটস টাইমস অবলম্বনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *