ভাইরাসভীতি উপেক্ষা করেই ম্যারাডোনাকে শেষ শ্রদ্ধা

ভাইরাসভীতি উপেক্ষা করেই ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনাকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ভক্তরা। ম্যারাডোনার প্রতি আর্জেন্টাইনদের ভালোবাসার কাছে মরণভয় যেন তুচ্ছ। কিংবদন্তিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বুয়েন্স আইরেসের রাস্তায় নেমে এসেছে হাজারো আর্জেন্টাইন। আর্জেন্টিনা মানেই ম্যারাডোনা, ম্যারাডোনা মানেই আর্জেন্টিনা-তাদের মাতমে সেটাই যেন আরও একবার নতুন করে প্রমাণ হলো।

করোনাভাইরাসের আঘাতে পুরো বিশ্ব বিপর্যস্ত। এই ভাইরাস মহামারি থেকে বাঁচতে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সবখানে। কিন্তু স্বাস্থ্য ঝুঁকির পরোয়া না করেই ম্যারাডোনাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভক্তরা ভীড় জমান।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বুধবার মারা যান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত ম্যারাডোনা। ভক্তদের কাছে যার পরিচয় ‘ফুটবল ঈশ্বর।’ বৃহস্পতিবার কাসা রোসাদার প্রেসিডেন্সিয়াল ভবনে রাখা হয় ম্যারাডোনার মৃতদেহ। তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে হাজির হন ভক্তরা।

হাতে গোলাপ নিয়ে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ৫২ বছর বয়সী চাকরিজীবী মার্সেলো গাদেস যেমন এখানে না আসার কোনো কারণ দেখছেন না।

তিনি বলেন, এখানে তো থাকতেই হবে। এই সময় এখানে না আসার তো কোনো কারণই নেই। ম্যারাডোনাও এমনই, নিয়ম মানে না। সব ভালো ও সব খারাপ মিলিয়েই আর্জেন্টিনা মানেই ম্যারাডোনা, ম্যারাডোনা মানেই আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ। মারা গেছেন ৩৭ হাজারের বেশি। দেশটির সরকার গত মার্চে কঠোর লকডাউন দিয়েছিল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও ভ্রমণে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।

প্রাসাদের প্রবেশপথের মুখে অবশ্য স্যানিটাইজার সরঞ্জাম রেখেছিল কর্তৃপক্ষ। সেখানে লোকজন মিছিল করছিল, অনেক সমর্থক প্রবেশপথের সামনে ভিড় করেছিল। কেউ কেউ আবার মাস্ক ছাড়াই গান গাইছিল এবং পান করছিল।

এখান থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখছেন আর্জেন্টিনার ৫৫ বছর বয়সী চিকিৎসক আলবের্তো উগালদে।

তিনি বলেন, ম্যারাডোনাকে বিদায় জানাতে এত মানুষের একত্রিত হওয়াটা কোভিড-১৯ সরাসরি সংক্রমণের একটি উৎস। রাস্তায় লোকেরা ভিড় করছে, এমনকি অনেকে মাস্ক ছাড়াই এসেছে। তাদের কষ্ট আমি বুঝতে পারছি, তিনি আমাদের আইডল। কিন্তু স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও তো অনেক বেশি।

বাবা মায়ের পাশেই সমাহিত ম্যারাডোনা

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের বেল্লা ভিস্তায় বাবা-মায়ের সমাধির পাশেই ম্যারাডোনাকে সমাহিত করা হয়। একেবারেই পরিজন ঘেরা ছিল সমাহিত করার সেই আয়োজন।

বিবিসি জানায়, করোনা সংক্রমণের শঙ্কা উপেক্ষা করে লাখো ভক্ত সমবেত হয়েছিলেন শেষবারের মতো প্রিয় ফুটবলারের কফিন স্পর্শের আশায়। আগতদের সবারই চোখে জল, হাতে ফুল। কারো পরনে ছিল ১০ নম্বর জার্সি নয় ম্যারাডোনার ছবি সম্বলিত পোশাক। কেউ দূর থেকেই প্রিয় মানুষটির হাওয়ায় ছুড়ে দিয়েছেন চুমু।

প্রসঙ্গত, আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা বুধবার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে প্রায় একাই বিশ্বকাপ জেতানো এই কিংবদন্তির মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়েছিল।

মাসের শুরুতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের জন্য অস্ত্রোপচার করাতে হয় সাবেক নাপোলি ও বোকা জুনিয়র্স তারকাকে। প্রথম দিকে দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু অ্যালকোহল আসক্তির কারণে নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় অনেক বেশি সময় সেখানে থাকতে হয়। মাত্র ৬০ বছর বয়সে কোটি ফুটবলভক্তকে কাঁদিয়ে অন্য পারের বাসিন্দা হলেন বাঁ পায়ে অসংখ্য মুহূর্তের জন্ম দেয়া ফুটবল কিংবদন্তি।

ম্যারাডোনার মৃত্যুর তদন্ত দাবি আইনজীবীর

ম্যারাডোনার মৃত্যু ঘিরে রহস্য দানা বাঁধছে ক্রমশ। আর এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তার আইনজীবী মাতিয়াস মরিয়া নিজেই। বলেছেন, তদন্ত করতে হবে, কেন দিয়েগো চিকিৎসাহীন ছিলেন দিনের আধাবেলা। অ্যাম্বুলেন্স আসতে আধাঘণ্টা দেরি হলো কেন? এই প্রশ্নও সামনে এনেছেন।

আইনজীবী মাতিয়াস মরিয়া এক বিবৃতিতে পূর্ণ তদন্ত দাবি করেছেন। আইনজীবী মরিয়াই ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর প্রথম জানিয়েছিলেন।

বুধবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কিংবদন্তি ফুটবলার ম্যারাডোনা মারা যান। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের উত্তরে টিগ্রেতে এক ভাড়াবাড়িতে ম্যারাডোনার মৃত্যু হয়।

টুইটারে দেয়া বিবৃতিতে মরিয়া চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থাকাকে অপরাধমূলক মূর্খতা বলে বর্ণনা করেছেন।

আর্জেন্টিনার গণমাধ্যম অবশ্য রিপোর্ট করেছে, খবর পাবার সঙ্গে সঙ্গে ৯টি অ্যাম্বুলেন্স তার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

মরিয়ার কথা, অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছেছিল এটা ঠিক, কিন্তু আধাঘণ্টা পর। কেন এত সময় নিল, এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা তদন্ত করে দেখতে হবে। এটা এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। দিয়েগো তাকে বলে গেছেন, তুমি আমার সৈনিক। ক্ষমাহীন দৃষ্টিতে সবকিছু দেখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *