অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাই এখন রাষ্ট্রের বোঝা

বাংলাদেশে গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুত খাতে ব্যাপক উন্নয়নের ফলে এখন চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উপাদিত হচ্ছে। কিন্তু এটা আশীর্বাদ হিসেবে আসেনি, এসেছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপর বোঝা হিসেবে। ইন্সটিটিউট অব এনার্জি ইকনমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল এনালাইসিসের (আইইইএফএ) জন্য সাইমন নিকোলাস ও সারা জেন আহমেদের করা এক গবেষণাপত্রে এই চিত্র ফুটে উঠেছে।

সমস্যা আরো জটিল হয়েছে- শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সাল পর্যন্ত দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আরো বাড়াতে চান বলে। হাসিনার ‘ভিশন ২০৪১’-এ বাংলাদেশ থেকে চরম দারিদ্র দূর করে দেশকে একটি উচ্চমধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখা হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যের চাকা সচল রাখার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন। তাই সরকার ১৪টি চীনা তহবিল-পুষ্ট কয়লা চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ‘রিভিজিটিং পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান (পিএসএমপি) ২০১০’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। কয়লা ও এলএনজি প্লান্টগুলোর ব্যবহার ৬০% ধরে নিয়েও ওই রিপোর্টে বলা হয় যে ২০২৯-৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ২৮১ টিডব্লিউএইচ (টেরাওয়াট ঘন্টা) বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। পিএসএমপি পুনর্মূল্যায়ন অনুযায়ী ২০২৯-৩০ সালে বাংলাদেশের যা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে তার চেয়ে ৫৮% বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

কিন্তু আইইইএফএ গবেষণায় বলা হয়, এই ১০৪ টিডব্লিউএইচ বিদ্যুতই চাহিদার চেয়ে বেশি। আইইইএফএ’র রক্ষণশীল হিসাবে আইএমএফ’র ভবিষ্যদ্বাণী আমলে নিয়ে বলা হয় যে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২% কমে যাবে। এরইমধ্যে এর লক্ষণ ফুটে উঠেছে। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বাংলাদেশের নিটওয়্যার ও রেডিমেড গার্মেন্ট (আরএমজি) সেক্টর এরই মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল বা স্থগিতের শিকার হয়েছে। দেশের রফতানি আয়ের ৮০%-এর বেশি আসে আরএমজি খাত থেকে।

আইএমএফের সর্বশেষ আভাসে যদিও ২০২১ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হবে উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু মহামারীর কারণে সেটা একেবারেই অনিশ্চিত বলে মনে করেন নিকোলাস ও আহমেদ।

অতিরিক্ত ক্ষমতা, উৎপাদনের সমস্যা

এমনকি চীনের তহবিলপুষ্ট স্বল্প-ব্যবহৃত পায়রা মেগা কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আগেই বাংলাদেশের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি ছিলো। যার ফলে অলস বসে থাকা কেন্দ্রগুলোকে বিপুল অংকের ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ পরিশোধ করতে হয়েছে। ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ হলো কোন বিদ্যুৎ উৎপাদকের উৎপাদন সামর্থ অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা, যদিও তার কাছ থেকে আংশিক বিদ্যুৎ নেয়া হয়েছে। অব্যবহৃত সামর্থ্য ভবিষ্যতে কখনো চাহিদা বাড়লে সেটা পূরণের জন্য রেখে দেয়া হয়।

অতিরিক্ত সামর্থ্য ছাড়াও, বাংলাদেশের বিদ্যমান সামর্থ্য গড়পরতায় স্বল্প-ব্যবহৃত রয়ে গেছে। ২০১৮-১৯ সালে ব্যবহৃত হয় মাত্র ৪৩%। কখনো কখনো দুই-তৃতীয়াংশই অব্যবহৃত থেকে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৮-১৯ সালে অলস বসে থাকা কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে ১.১ বিলিয়ন ডলার। এই মূল্য চামড়ার মতো বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় রফতানি শিল্পের মূল্যের চেয়েও বেশি। চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রফতানি থেকে বাংলাদেশের আয় ১.০৮ বিলিয়ন ডলার।

নিকোলাস ও আহমেদ উল্লেখ করেন যে, চীনা তহবিলের পায়রা কয়লা-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতি মাসে ১৯ মিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পাচ্ছে। সঞ্চালন লাইন সংযোগে বিলম্বের কারণে এর অর্ধেক ক্ষমতা কাজে লাগছে না।

বিপিডিবি’র ক্ষতিপূরণ

সরকারের ভর্তুকি থেকে বিপিডিবি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লোকসান দিচ্ছে। করোনার কারণে বিপিডিবি’র রাজস্ব আয় আরো কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করে যাচ্ছে বোর্ড।

সরকার বিপিডিবি-কে ভর্তুকি দেয়ার কারণ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ক্রয়মূল্যের চেয়ে খুচরা বিক্রিমূল্য কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিপিডিবি-কে ৯৩৬ মিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হয়। এছাড়াও প্রথমবারের মতো ২০১৮-১৯ সালে দেয়া পুরো ভর্তুকিকে ঋণের বদলে ‘মঞ্জুরি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিপিডিবি আশঙ্কা করছে যে ২০১৯-২০ সালে সাবসিডির পরিমাণ ১.১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এর মানে হলো করদাতাদেরকেই শেষ পর্যন্ত এই বিল পরিশোধ করতে হবে।

খুচরা বিক্রি মূল্য বৃদ্ধি

বিপিডিবি-কে ভর্তুকি দেয়া ছাড়াও সরকার বিদ্যুতের খুচরা বিক্রি মূল্য বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়িয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মূল্য বাড়ানো হয় ৫.৩%। ফলে বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য দাঁড়ায় ৭.১৩ টাকা। ভবিষ্যতে আরো মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।

২০১৯-২০ সালে বিপিডিবি’র ১ বিলিয়ন ডলারের বিপুল লোকসান কমানোর জন্য রাজস্ব বা ভর্তুকি বাড়ানো প্রয়োজন। কাভিড-১৯-এর কারণে এই পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে বলে নিকোলাস ও আহমেদ সতর্ক করে দেন।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী বলেন যে, আমদানি করা কয়লা ও এলএনজি চালিত নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিশাল বহর উৎপাদনের খরচ কমিয়ে আনবে। এটা আরো বেশি ছিলো যখন আমদানি করা তেল ও ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। কিন্তু এ কথা বিভ্রান্তিকর বলে নিকোলাস ও আহমেদ মনে করেন। প্রথমত, তুলনা করার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি বেঞ্চমার্ক অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চলক আমলে নিতে হবে।

তারা যুক্তি দেখান, প্রযুক্তি নির্বিশেষে মূল্য তুলনা করতে হলে সব ধরনের মূল্য বিবেচনায় নিতে হবে। এর মধ্যে নতুন অবকাঠামোর জন্য মূল্য, জ্বালানির মূল্য, বিনিময় হার, বিলম্বের কারণে প্রকল্পের মূল্য বৃদ্ধি, ইত্যাদি রয়েছে। কয়লা ও এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বড় আকারের অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। এটা ব্যয়বহুল।

নবায়নযোগ্য উৎসের পক্ষে বক্তব্য

নিকোলাস ও আহমেদ মনে করেন যে আমদানি করা কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য প্রাকৃতিক গ্যাস, বায়ু ও সৌর জ্বালানির দিকে মনযোগ দেয়া উচিত হবে হাসিনা সরকারের। এগুলো স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কম।

তারা সতর্ক করে বলেন, বিপিডিবি’র নিজস্ব গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ ২.৫ টাকা/কেডব্লিউএইচ। যা আমদানি করা কয়লা ও এলএনজির বিদ্যুতের চেয়ে অনেক কম। দেশীয় গ্যাসের বদলে আমদানি করা কয়লা ও এলএনজি ব্যবহার করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ কমবে। ২০১৯ সালে একটি নতুন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়, যার রাজস্ব হলো ৬৫ ডলার/এমডব্লিউএইচ। বাংলাদেশ সরকার ভালোভাবে সহায়তা দিলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য জায়গার মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ আরো কমে যাবে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কয়লা ছেড়ে জ্বালানির নবায়নযোগ্য উৎসের পক্ষে কথা বলছে। বাংলাদেশ কয়লার বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির জন্য চীনকে প্রস্তাব দিতে পারে।

নিকোলাস ও আহমেদ যুক্তি দেখান যে নবায়নযোগ্য ও স্থানীয় জ্বালানির উৎস ব্যবহার করলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সঙ্কট ও জ্বালানি সরবরাহ ক্ষেত্রের আঘাত থেকে রক্ষা পাবে। তাছাড়া, আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবেশ দূষণ এড়ানো যাবে।

সাউথ-এশিয়ান-মনিটর অবলম্বনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *